অষ্পর্শীত প্রেম

অষ্পর্শীর সাথে আমার পরিচয় ভার্সিটির প্রথম ক্লাশে। কলেজ লাইফে খুব একটা ক্লাশ করি নি। মাসে ২-১ দিন গেলেও সাথে সাথে বাসায় চলে আসতাম, ভালো লাগতো না। কথাও বলতাম না কারো সাথে। কিন্তু কলেজ জীবন শেষ করে করে বুঝতে পেরেছি জীবন থেকে কি হারিয়ে ফেলেছি। জীবনের সব চাইতে আনন্দের দু’টা বছর এমনি এমনিতেই শেষ করে ফেলেছি। তাই ভার্সিটিতে ওঠার আগেই মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম যে প্রথম ক্লাশ থেকেই নিজের লুকিয়ে রাখা সব চঞ্চলতাকে প্রকাশ করতে শুরু করবো।

সেই ভাবনা থেকেই ভার্সিটির প্রথম ক্লাশে গিয়েই সবার সাথে আগ বাড়িয়ে কথা শুরু করলাম। সবাই মোটামুটি হাসিখুশি হয়েই কথা বলছিল, শুধু একটা মেয়ে বাদে। ক্লাশের শেষ বেঞ্চে বসে থাকা মেয়েটা। নাম জিজ্ঞেস করতেই অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তাই টেবিলের উপর থেকে ওর খাতাটা হাতে নিয়ে দেখা শুরু করলাম। প্রথম পৃষ্ঠাতেই বড় করে লেখা “অষ্পর্শী”। “তোমার নাম অষ্পর্শী?” কোন উত্তর দিল না, শুধু একটা হাসি ছাড়া। বড়ই মায়াবী সেই হাসিটা আজও আমার চোখের সামনে ভাসে, মনে হয় যেন জীবন্ত দেখছি।

মেয়েটাকে দেখতাম সবসময় একা একা থাকতে। কারো সাথেই খুব বেশি মিশতো না। দরকার ছাড়া খুব একটা কথাও বলতো না। ওর এমন অদ্ভুত সব আচরন দেখে ওর প্রতি একটা আকর্ষন বোধ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ক্লাশের মধ্যে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। মাঝে মাঝে চোখে চোখ পড়ে যেত। ও তখন চোখ সরিয়ে নিত আর নিচের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতো।

প্রায় প্রতিদিনই ওর সাথে কথা বলার অনেক রকম ফন্দি এঁটেছি। কিন্তু কোনটাতেই কাজ হয়নি। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, ওকে কিছু করতে বললে সেটা করতো। যদি বলতাম লেকচার তুলে দাও, তুলে দিত। কলম আনি নি, কলম বের করে দিত কিন্তু আমার সাথে কখনো একটা শব্দও উচ্চারন করেনি।

একদিন ওর কাছে নোট ধার চাইলাম, চোখের দিকে তাকিয়ে ব্যাগ থেকে নোট বের করে দিল। খুলে দেখলাম নোটের মাঝখানে মাঝখানে অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকা। একটা মেয়ে জানালার ওপাশে দাড়িয়ে আছে, নীল পরী, একটা মেয়ে দোলনায় দুলছে আরও কত কি। এর পর থেকেই মাঝে মাঝে ওর নোট ধার করে নিতাম। যতটা না পড়ার উদ্দেশ্যে, তার চাইতে বেশি ওর আঁকা ছবি দেখতে আর তা ফটোকপি করে ঘরের দেয়ালে সাজিয়ে রাখতে।

একটা সময় বুঝতে পারলাম আমি ওর মোহে পড়ে গিয়েছি। ভার্সিটিতে যতক্ষন থাকতাম, সারাক্ষন ওর পাশে পাশেই থাকতাম। এমন কি ও যখন কোথাও যেত, ওর বান্ধবী মৌমি আমাকে জানিয়ে দিত যে কোথায় যাচ্ছে। আর আমি আগে থেকেই সেখানে হাজির হয়ে থাকতাম, ওকে দেখার জন্য। এমনও দিন গিয়েছে যে পকেটে টাকা ছিলো না, তিন কিলোমিটার পথ হেটে গিয়েছি শুধু ওকে দেখার জন্য।

অষ্পর্শী খুব ভালো গান গাইতে পারতো। বিকেলে যখন ওদের বাসার পাশের চায়ের দোকানে গিয়ে বসে থাকতাম ওকে দেখার জন্য, ওকে দেখতাম ছাদের কোনে বসে গাইছে। অষ্পর্শী তখন বারবার আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতো। সে হাসি দেখতে দেখতে কখন যে হাতের গরম চা, ঠান্ডা শরবত হয়ে যেত টেরই পেতাম না।

এভাবে চলতে চলতে একটা সময় মনে হতে লাগলো আমি সত্যিই অষ্পর্শীর প্রতি অনেক দূর্বল হয়ে পড়েছি। ওর নাম, চেহারাটা যে এক মুহূর্তের জন্য আমার মনের থেকে দূরে রাখতে পারছি না। বুঝতে পারছিলাম যে আমি হয়তো অষ্পর্শীকে ভালোবেসে ফেলেছি। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। যে মেয়ে আমার সাথে কথাই বলে না, তাকে ভালোবাসার কথা বলবো কি করে? মৌমির সাথে বিষয়টা শেয়ার করলাম, ও বললো ও কিছুই করতে পারবে না।

শেষমেষ অনেক সাহস নিয়ে তিন রাত জেগে অষ্পর্শীকে আমার মনের লুকনো সব কথার ফুলঝুড়ি সাজিয়ে চিঠি লিখলাম। চিঠিটা সরাসরি ওর হাতে দিতে খুব ভয় পাচ্ছিলাম আর সরাসরি দিলেও হয়তো নিতো না। তাই ক্লাশের বিরতিতে ও যখন বের হয়েছে, চিঠিটা ওর ব্যাগে ঢুকিয়ে দিলাম। মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম অন্তত যেন চিঠিটা পড়ে।

তারপর দিন ক্যাম্পাসে ঢুকেই শুনলাম কয়েকজন অষ্পর্শীর নাম নিয়ে কি যেন বলছে। ক্লাশ শুরু হতে অল্প সময় বাকি থাকাতে ওদের কথায় কান না দিয়ে তাড়াতাড়ি ক্লাশে গেলাম। হৃদষ্পন্দটা যেন তখন থেকেই দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ক্লাশে ঢুকেও দেখি সবাই অষ্পর্শীর ব্যাপারেই কথা বলছে। আমাকে দেখেই সবাই চুপ, বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে। খানিকটা স্তম্ভিত হয়ে গেলাম, আমাকে দেখে সবাই চুপ হয়ে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন? অষ্পর্শীও ক্লাশে আসেনি। মৌমিকে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে? জিজ্ঞেস করতেই ও আমাকে ধরে কাঁদতে লাগলো। বললো চল, অষ্পর্শীদের বাসায় চল। অজানা এক শংকায় মনটা চুপসে গেল। ওকে নিয়ে তাড়াতাড়ি করে অস্পর্শীদের বাসায় গেলাম। গিয়ে দেখি বাসার সবাই কান্না করছে, ওদের বাসার নিচে একটা খাট, লাশের খাঁট। গুটিগুটি পায়ে খাটের দিকে এগিয়ে গেলাম। আর তারপর লাশের মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে যা দেখলাম, তা কখনো চিন্তাও করিনি। এ যে অষ্পর্শী! নিশ্চুপ মেয়েটা আজ আরও নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে আছে!

এর কিছুদিন পর ওদের বাসায় গিয়েছিলাম ওর পরিবারের খোঁজ খবর নিতে। অষ্পর্শীর মায়ের সাথে অনেক কথা হলো। জানতে পারলাম মেয়েটা ছোট বেলা থেকে খুব চঞ্চল ছিলো। সবার সাথে মিশতো, হাসতো খেলতো। কিন্তু ছয় মাস আগের একটা ঘটনা ওকে পুরো নিশ্চুপ করে দিয়েছে। হঠাৎ করেই একদিন ও অজ্ঞান হয়ে যায়। ডাক্তারের কাছে নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানা যায় ওর ব্রেইন ক্যান্সার হয়েছে। খুব বেশিদিন বাঁচবে না। ডাক্তার যদিও অসুখের কথাটা অষ্পর্শীকে বলতে নিষেধ করেছিল কিন্তু ও কিভাবে যেন জেনে যায়। তারপর থেকেই কারো সাথে খুব বেশি কথা বলতো না, মিশতো না। কথার ফাঁকে আন্টি অষ্পর্শীর রুমে নিয়ে গেলেন। মারা যাওয়ার পর থেকেই ওই রুমটাতে কেউ যায় না। ওর পড়ার টেবিলের উপর একটা ডায়েরী রাখা ছিল। আন্টির অনুমতি নিয়ে ডায়েরীটা খুললাম। ডায়েরীর প্রথম পাতা দেখেই চোখটা জলে ছলছল করে উঠলো। সেখানে যে আমারই ছবি আঁকা, আর তার নিচে সুন্দর করে লেখা, “আমি তোমাকে ভালোবাসি”…

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


Scroll to Top