জান্নাত আর আমার বাড়ি পাশাপাশি। আমার চাইতে তিন বছরের ছোট। জান্নাতের যখন জন্ম হয়, আমি নাকি ওকে অনেক আদর করতাম, কোলে নিয়ে বসে থাকতাম। ওকে ছেড়ে সহজে যেতে চাইতাম না। একদিন সেই তিন বছর বয়সেই নাকি আমি ঘর থেকে কাঁথা-বালিশ নিয়ে ওদের ঘরে চলে গিয়েছিলাম ওর পাশেই থাকবো বলে। এই কারণে যখন একটু আধটু বুঝতে শিখলাম, সবাই আমাকে খেপাত ঘর জামাই বলে!
আমি যখন স্কুলে যেতে শুরু করলাম, ও তখনো স্কুলে ভর্তি হয়নি। কি এক অজানা কারণে যেন স্কুলে মন বসত না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতাম স্যারদের দিকে। স্যাররা তো তখন আমাকে প্রতিবন্ধী ভেবেছিলো, তাই বাবাকে বলেছিল ডাক্তার দেখাতে। সত্যি একটা কথা হচ্ছে প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডির মধ্যেই আমি তিনবার ফেল করেছিলাম। তারপর হাই-স্কুলে পা রাখলাম। আমার ফেল করার কারণে জান্নাত ও আমার ক্লাসে উঠে গেল। তখন থেকে যেন জাদুর মত আমার বুদ্ধিও খুলে গেলো। ও সব পরীক্ষাতে প্রথম হতো, আর আমি দ্বিতীয়। আমরা খুব সকালে গল্প করতে করতে হেঁটে স্কুলে যেতাম। রাস্তায় অনেক ফাজলামি করতাম। আমি গাছে উঠে থেকে আম পারতাম, আর ও টোকাতো। সেই আম দুজনে মিলে খেতাম, আর ক্লাসের বন্ধুদের ভাগ করে দিতাম। টিফিন পিরিয়ডে দুজন একসাথে টিফিন খেতাম, খাইয়ে দিতাম। আমার যতদূর মনে পরে, আমরা কখনো ২টা আইসক্রিম একসাথে কিনি নি কিংবা কখনো দুই প্লেট চটপটিও না। সব সময় একটাকে ভাগ করে খেতাম। কে আগে খাবে, সেটা নিয়ে ঝগড়াও করতাম। তবে উল্টো। আগে খয়ার জন্য না, কে পরে খাবে সে জন্য। আর পড়ন্ত বিকেলে রিক্সায় করে যখন বাসায় ফিরতাম, ওর একটা অদ্ভুত বায়না ছিল। আমাকে ওর ধরে বসতে হবে। না ধরে রাখলে নাকি ও রিক্সা থেকে পরে যাবে।
আমারা যখন ক্লাস ৮ এ উঠি, তখনই প্রথম আমরা বুঝতে পারি যে আমাদের সম্পর্কটার নাম ভালবাসা। আমরা জানতাম যে আমরা দুজনই দুজনকে খুব ভালবাসি, কিন্তু কেউ কাউকে বলার সাহস পাচ্ছিলাম না। তারপর অনেক সাহস করে একটা চিঠি দিলাম। চিঠিটা পাওয়ার পর দুই দিন ও আমার সাথে কোন কথাই বলল না! আমি তোঁ ভয়ে শেষ, কি জানি কি হয়। ৩য় দিন, আমাদের বাড়ির পাশে একটা পুরনো বাড়ি ছিল, বিকেলে ওখানে ডাকল। ভয়ে ভয়ে কেমন আছো জিজ্ঞেস করতেই একটা থাপ্পড়… “এই কথাটা বলতে এতদিন লাগে গাধা?” তারপর জীবনে প্রথমবার ওকে জরিয়ে ধরা! আমার মনে আছে, এতটা জোরে ধরেছিলাম যেন মনে হচ্ছিল পাঁজরের হাড় ভেদ করে দুজন মিলেমিশে এক হয়ে যাবো। এরপর থেকে আমার প্রায় প্রতিদিন এমনকি রাতেও সেই পুরনো বাড়ির পুকুর ঘাটে বসে কথা বলতাম, চাঁদ দেখতাম, তারা গুনতাম। কখনো আমার কাঁধে ওর মাথা, কখনো ওর কোলে আমার মাথা রেখেই পার হয়ে যেত আমাদের মিষ্টি সময়গুলো। ওর সাথে অনেক ঝগড়াও করতাম, অনেক পাজি ছিল। ক্ষেপে গেলে ও রাগে ফোঁস ফোঁস করত। কিন্তু, তখন শুধু “ভালবাসি” বললেই লজ্জায় লাল হয়ে যেত আর মাথাটা এলিয়ে দিত আমার বুকে। এই কারণে আমিও ওকে ইচ্ছা করে খেপাতাম। খুব উপভোগ করতাম ওর এই জিনিষটা।
ও ওর ছোট খালার বাসায় থাকতো। কারণ ওর ছোট খালার একা মানুষ, একটি মাত্র ছেলে তাও আবার বিদেশ থাকে। অন্য দিকে ওর পরিবারের আর্থিক অবস্থাও বেশি ভালো ছিল না। সেদিন ও বলছিল যে ওর খালাত ভাই বিদেশ থেকে আসবে, ওর জন্য নাকি এটা আনবে, ওটা আনবে। ওর জন্য নাকি একটা রাঙা ভাবিও আনবে দেশে ফিরে। এটা নিয়ে কয়টা দিন ধরে অনেক খুশি ওর মনে। কিছুদিনের মধ্যে ওর ভাই আসলো। এর কয়েকদিন পর ওরা সবাই ওদের বাসায় বেড়াতে গেলো। যাওয়ার সময় যখন আমরা পুকুর পাড়ে বসে কথা বলছিলাম, কেন জানি আমার চোখে পানি চলে আসছিলো ওর যাওয়ার কথা শুনে। পরম যত্নে ওর আচল দিয়ে সেই পানি মুছে দিয়ে বলল “আমি কখনো তোমার কান্নার মুখ দেখতে চাই না। একটু হাস না।” অনেকটা জোর করেই ওকে তখন হাসি মাখা মুখে বিদায় দিয়েছিলাম।
১২ দিন পর ওরা ফিরে এলো। আমার কাছে মনে হচ্ছিল যেন ১২ টা বছর। ওকে দেখেই আমার বুকটা কেমন যেন কেপে উঠলো। ওর সেই হাসি মাখা মুখটা কেমন যেন মলিন হয়ে গেছে। ওর কাছে যেতেই যেন দেখেও না দেখার ভান করে চলে গেলো। কিন্তু ও তো কখনো এমন করে না। কোথাও থেকে ফিরে আগে আমার সাথে দেখা করে, তারপর বাসায় যায়। একটা সংশয়ে আমিও কিছু জিজ্ঞেস করলাম না, ওদের সবার মধ্যেই কেমন যেন একটা ভাব। তারপর চলে এলাম সেই পুকুর পাড়ে। জানতাম, ও যদি আমাকে খুঁজে, প্রথমে এখানেই আসবে। অনেকক্ষণ পর সত্যিই আসলো। কিন্তু সেই চিরচেনা হাসি মুখে না, ফ্যাকাসে আর রক্ত শূন্য একটা মুখ নিয়ে। ওর সেই ভয়ার্ত মুখে হাত দিতে যেতেই এক পা পিছে সরে গেলো। আর তারপর যেটা দেখলাম সেটা কখনো ভুল করে স্বপ্নেও দেখি নি! ওর নাকে একটা নীল রঙের নাক-ফুল…
ওর জন্য আমি কখনো কান্না করিনি। কারণ ওর প্রতিটা কথাই আমি রেখেছি, যা চেয়েছে করেছি। হুম, সেই শেষে কথাটাও…
