অন্ধ ভালোবাসা

জান্নাতের সাথে আমার প্রথম দেখা ওর সাথে ধাক্কা লেগে। তবে সেটা কোন সিনেমাটিক ষ্টাইলে নায়ক নায়িকার ধাক্কা ছিলো না।

ভার্সিটি লাইফের প্রথম দিকের কোন একটা দিন। আমি অন্য মনস্থ হয়ে ক্যাম্পাসে হাটছিলাম। তারপর হঠাৎ করেই একটা মেয়ের সাথে ধাক্কা। মেয়েটাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই শুরু করলাম, দেখে চলতে পারেন না? চোখ কি অন্ধ নাকি? কিন্তু মেয়েটার দিকে যখন খেয়াল করলাম, দেখলাম মেয়েটার কালো সানগ্লাসের ফাঁক দিয়ে পানি পড়ছে আর হাতে সাদা ছড়ি। বুঝতে বাকি রইল না যে মেয়েটা সত্যিই অন্ধ। দায়িত্ব এড়াতে শুধু সরি বলেই হাটা শুরু করলাম। কিন্তু কিছুটা দূর যাওয়ার পর মনে হলো যে মেয়েটা হয়তো অনেক কষ্ট পেয়েছে, ভেবেছে হয়তো আমি জেনেশুনেই ওকে অন্ধ বলেছি। তাই আবার দৌড়ে গেলাম ওর কাছে।

: এই যে শুনছেন?
: হ্যাঁ বলুন।
: আমি না তখন বুঝতে পারি নি যে আপনি সত্যিই চোখে দেখতে পান না। না বুঝেই তখন বলে ফেলেছি কথাটা। দুঃখিত।
: নাহ্, ঠিক আছে। যা বলেছেন, তা তো সত্যি। আমি তো দেখতে পাই না।
: আপনি কথাটা এভাবে নিচ্ছেন কেন?
: হ্যা, বুঝতে পেরেছি তো কি বলেছেন।

এর কয়েকদিন পর আবার ভার্সিটির ক্যান্টিনে দেখা।

: হ্যালো…
: হাই…
: আমি…
: সেদিন ধাক্কা লেগেছিল, সে না?
: হ্যাঁ। কিভাবে চিনলেন?
: কন্ঠ শুনে।
: বাহ্, আপনার শ্রুতি আর স্মৃতি শক্তি তো দারুন!
: হুম, সবারই তো একটা দিক অন্তত প্রখর থাকে।
: হ্যাঁ, তা ঠিক। ওহ আচ্ছা আমি ধাক্কাবাজ, এটা কিন্তু আমার পরিচয় না। আমার নাম তানু। আপনি?
: জান্নাত।

আমাদের পরিচয়টা এভাবেই। ওর থেকেই জানতে পারলাম ও জন্ম থেকেই অন্ধ। পৃথিবীর আলোটা কখনো দেখা হয়নি ওর। পরিবারে সে একমাত্র মেয়ে। বাবা ছোট একটা চাকুরী করে। আর পড়ে আমাদের ভার্সিটিতেই, অন্ধদের জন্যে বিশেষায়িত ব্রেইল বিভাগে।

তারপর থেকে আমাদের প্রায়ই দেখা হতো। অবশ্য দেখা হতো বললে ভূল হবে, কথা হতো। ও তো আমায় দেখতে পেত না, তাই আমি ওকে যখনই দেখতাম, কাছে গিয়ে কথা বলতাম। ও শুধু আমার হ্যালো শুনলেই চিনে নিতো, তানু?

ওর প্রতি আমি কেমন যেন একটা টান অনুভব করতাম। ভার্সিটিতে গেলেই ওকে খুঁজতাম, কথা বলতাম, পাশে থাকতাম। এভাবে একসাথে থাকতে থাকতে একটা সময় আমাদের মাঝে খু্ব ভালো একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে গেল।

ও সাধারনত কারো সাথে মিশতো না। যতক্ষণ ভার্সিটিতে থাকতো, ক্লাসে আর আমার সাথেই থাকতো। আমরা একসাথে ক্যান্টিনে বসতাম। আড্ডা দিতাম। একটা সময় থেকে আমি ওকে প্রতিদিন ওর বাসা থেকে ভার্সিটিতে নিয়ে আসতাম, আবার দিয়ে আসতাম।

ওর আব্বু-আম্মুও আমাকে অনেক আদর করতো। মাঝে মাঝে যখন ওকে দিয়ে আসতে যেতাম, আম্মু জোর করে বসিয়ে খাইয়ে দিতো। আম্মুর আরেকটা জিনিষ খুব ভালো লাগতো। সব সময় মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করে দিতো।

আমরা যখন একসাথে থাকতাম, ও ছড়িটা ভাজ করে রেখে দিত আর আমার হাত ধরে হাটত। মাঝে মাঝে আমরা ঘুরতে যেতাম। আর তখন প্রায়ই আমার মুখে হাত দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করতো আমি দেখতে কেমন। ওর এই জিনিষ গুলো আমিও অনেক উপভোগ করতাম।

ওকে ছাড়া আমি একটা মুহূর্ত থাকতে পারতাম না। সব সময় খোঁজ নিতাম, কি খেয়েছে, কি করছে। মাঝে মাঝে ও অসুস্থ হয়ে গেলে আমি অস্থির হয়ে যেতাম। ওদের বাসায় যেতাম, তখন সকাল-সন্ধ্যা ওর পাশেই থাকতাম।

একটা সময় বুঝতে পারলাম আমরা দুজনই হয়তো দুজনকে ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্তু ও হয়তো ওর সীমাবদ্ধতার জন্য কখনোই ওর মনের কথাটা বলবে না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম আমিই ওকে আগে বলবো।

একদিন বিকেলে, নদীতীরের কাশফুল বনে…

: জান্নত…
: বলো…
: আচ্ছা, আমি যখন তোমার হাতটা ধরি, তোমার কেমন মনে হয়?
: মনে হয়ে আলো খুঁজে পেলাম।
: তুমি কি এই আলোটা আজীবন ধরে রাখতে চাও না?
: চাইতো, কিন্তু ভয় হয়!
: কিসের ভয়?
: আলোটা কি থাকতে চাইবে আধারের সাথে?
: থাকবে, আধারের আলো হয়ে…

তারপর থেকেই জান্নাতের সাথে, আর জান্নাত পর্যন্ত…

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


Scroll to Top