অনেক দিন হলো হাসপাতালের মর্গে যাই না…

অনেক দিন হলো হাসপাতালের মর্গে যাই না। মানুষ নামের দু’পেয়ো প্রাণীটার শেষ রূপটা দেখি না। খুব টানছে, সময় পেলেই আবার দেখে আসব…

মিন্টু চৌধুরী। ৪৭ বছর বয়সী একটা লোক। শুনেছি টাকা পয়সার কোন কমতি নেই। শেষ রাতে মাতাল হয়ে বাসায় ফেরার সময় গাড়ি নিয়ে ট্রাকের নিচে ঢুকে চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। বেচারা, খুব সখ করে কেনা নাকি নতুন গাড়িটা নিয়ে প্রথম বেড়িয়েছিল।

রিয়া মনি। ১৮ বছর বয়সী পরীর মত একটা মেয়ে। প্রেমিকের সাথে অনেক দিন ধরেই ঝামেলা চলছিল। কিছুদিন আগে প্রেমিককে অন্য আরেক মেয়ের সাথে দেখে ঠিক থাকতে পারে নি। ব্যাস, সিলিং ফ্যানের সাথে ওড়না পেঁচিয়ে স্বেচ্ছায় ঝুলে গেছে।

রাকিব ব্যাপারী। ২৯ বছরের শক্ত-সামর্থ্য জোয়ান। এখন অবশ্য কোন শক্তিই অবশিষ্ট নেই। জমি-জমা, টাকা পয়সার কেলেঙ্কারিতে অনেকের সাথে বিরোধে জরিয়ে পরেছিল। রাতে হয়তো তাদেরই কেউ এসে কুপিয়ে ফেলে রেখে গেছে। প্রতিরোধ করতে পারে নি, হয়তো দলবল নিয়ে কুপিয়েছে।

মাহফুজা। কত হবে বয়স, ২৬ হয়তো। হাতের মেহেদির দাগ গুলো এখনও মোছে নি। তাতে কি? কথা ছিল বিয়ের পরের দিনের মধ্যেই তার বাবা যৌতুকের ২ লাখ টাকা পরিশোধ করে দিবে। অভাবের সংসারে বাবা সে টাকা যোগার করতে পারে নি। তাই বিয়ের সপ্তাহ গড়াতে না গড়াতেই শাশুড়ি-দেবরের দেয়া আগুনে ঝলসে গেছে দেহটা।

আলমগির শেখ। বয়স ৪০ এর বেশি হবে না। হঠাৎ করেই নাকি মাথা ঘুরে পরে গেছে। ব্রেইন স্ট্রোক, হাসপাতালে আনতে আনতে অনেক দেরি করে ফেলেছিল। অনেক চেষ্টা করেও বাঁচানো যায় নি। একটা মেয়ে আছে, ১২ বছর বয়সী। স্বপ্ন ছিল মেয়েটাকে ডাক্তার বানাবে। তা আর হল কই? এখন তো মা-মেয়ে কিভাবে চলবে সেটা নিয়েই টানাপড়েন লেগে যাবে।

রাসেদা বেগম। হাসপাতালের রেকর্ড অনুযায়ী বয়স ৫৩। শেষ ৩ টা মাস হাসপাতালেই ছিল। কি এক অদ্ভুত রোগ হয়েছিল। হাড়-চামড়া লেগে এক হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তাররা তো বলতেই পারল না কি রোগ। মর্গের বাইরে ছেলে মেয়েরা ২ ভাগে ভাগ হয়ে কথা বলছে। একদল লাশ ছাড়ানোর ব্যাপারে কথা বলছে, আরেকদল নানা বাড়ির সম্পত্তি চাওয়া ঠিক হবে কি না তা আলোচনা করছে।

রিফাত। ১৬ বছরের কিশোর। স্কুল থেকে ফিরছিল, কিন্তু মিছিলের মাঝে পরে শেষমেশ পুলিশের গুলিতে জীবনটা গেছে। শুধু যে গুলি খেয়েছে তা নয়। মিছিলের লোকজনের পায়ের নিচে পরে দেহটা একেবারে থেঁতলে গেছে। ডোম কেটে সেলাই করার পরে মানুষ না, থেঁতলানো মাংসপিণ্ড হয়ে যাবে।

রিমা আকতার। ২৫ কি ৩০ এর মধ্যে হবে বয়স। গার্মেন্টসে চাকরি করত। কি একটা মেশিনের যেন অপারেটর ছিল। অসাবধানতায় বিদ্যুৎ-পৃষ্ট হয়ে একদম শক্ত আর কালো হয়ে গেছে। বীভৎস অবস্থা, তাকানো যায় না…

মাঝে মাঝে মানুষ দেখলে খুব অবাক হই। কারণ এত অহংকার, এত গর্ব করা মানুষ গুলোর সাথে মর্গের ওই মানুষ গুলোর কোন মিল খুঁজে পাই না। এক মুহূর্তেই মানুষ এত বদলে যায় কিভাবে? কেনই বা আগের আর রূপে ফিরে আসে না?

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


Scroll to Top