আমাদের সামাজিকতা গুলো অনেক বেশি অসামাজিক।
বিয়ের কথা বলি। আমাদের সামাজিকতা হচ্ছে বিয়ের অনুষ্ঠান যথাসম্ভব জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে করতে হবে। লাখ টাকার গেইট, স্টেজ, আর প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার ছাড়া আজকাল বিয়ে জমে না।
ছেলের যতই টাকা থাক, মেয়ের বাড়ি থেকে ঘর ভর্তি ফার্নিচার না পাঠালে পাড়াপড়শিরা টিপ্পনী কাটে। আর ধুমধাম করে লোক খাওয়ানের ব্যাপার তে থাকেই। বরযাত্রীতে ছেলে পক্ষ সব সময় বেশি মানুষ জেতে চায়, এটা নাকি আভিজাত্য।
আর ছেলের বাড়ি থেকে মেয়েকে স্বর্ণ-গয়না দিয়ে সাজিয়ে না নিলে নাকি তাকে বউ বলা যায় না। তিন গ্রামের মানুষ দাওয়াত করে না খাওয়ালে পূর্বপুরুষের আভিজাত্য থাকে না।
কিন্তু অবাক করা বিষয় হচ্ছে, বরপক্ষ আর কন্যাপক্ষের মধ্যে দেনমোহর নিয়ে তর্ক হয়। বরপক্ষ চায় যথাসম্ভব কম দেনমোহর লিখতে, কন্যাপক্ষ চায় যথাসম্ভব বেশি দেনমোহর লিখতে। দেনমোহর হচ্ছে কনের অধিকার। শরিয়াহ অনুযায়ী বাসর ঘরে বউকে স্পর্শ করার আগেই দেনমোহর পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু আমরা দেনমোহরকে করে ফেলেছি সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য অস্ত্র। অর্থাৎ, যদি কোন কারণে স্ত্রীকে তালাক দেয়ার উপক্রম হয়ে, তবে বেশি দেনমোহরের ভয়ে যেন তালাক না দিতে পারে!
সব মিলিয়ে বিয়ে করতে হলে উভয় পরিবারের কম করে হলেও কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়। পরিসংখ্যান ছাড়াই বলতে পারি আমাদের দেশে খুব কম সংখ্যক পরিবার আছে যারা একসাথে নগদ কয়েক লাখ টাকা বের করতে পারবে।
আমাদের দেশে কন্যাদায় গ্রস্ত বাবার অভাব নেই, যারা কিনা শুধু টাকার অভাবে মেয়ে বিয়ে দিতে পারছে না। অন্য দিকে এতগুলো টাকা যোগার করে বিয়ে করতে করতে আমাদের ছেলেদের বিয়ের গড় বয়স স্বাভাবিকের অনেক উপরে উঠে গেছে।
আমি এই রকম অনেক মেয়ে দেখেছি যারা তার স্বামীকে নিয়ে সুখী নয়, শুধুমাত্র বয়সের পার্থক্যের কারণে। তারা একসাথে হাটে না, পিছনে লোক বাবা-মেয়ে ভাবতে পারে বলে! বয়সের এই বিরাট ব্যবধানের কারণে সংসারে ভালোবাসা বলে কিছু থাকে না। সদ্য যৌবনে পা দেয়া কিশোরী যখন একজন ভালোবাসার মানুষ আসা করে, স্বামী তখন তাকে দাসী হিসেবে ব্যাবহার করে।
কথা হচ্ছে, বিয়ে হচ্ছে আজীবনের বাঁধন। এটা মানুষকে দেখানোর আয়োজন না। বিয়ে প্রথমে পারিবারিক বিষয়, পরে পরিবার হলে হয় সামাজিক। সামাজিকতা রক্ষা করতে গিয়ে যদি পরিবার গঠনেই সমস্যা হয়ে যায়, তবে সেই সামাজিকতার আদৌ কোন গ্রহণযোগ্যতা আছে কি? আমি বলছি না সমাজকে অগ্রাহ্য করতে, তবে এই রকম অসামাজিক সামাজিকতা অবশ্যই সংশোধন করা দরকার।
কোন সুপ্রতিষ্ঠিত মানুষই প্রতিদিন কোরমা পোলাও খায় না। দিন শেষে সাদা ভাতই প্রিয় খাবার। সাধারণ বাড়িতে যা রান্না হয়, গড়পড়তা বড় বাড়িতে সেই একই রান্না হয়ে। আপনার মেয়েকে যে ভাত খাওয়ানোর নিশ্চয়তাটুকু দিতে পারবে, তার কাছে মেয়ে বিয়ে দিতে আপনার এত আপত্তি কেন?
আর, বউ পালা আর হাতি পালা বলে একটা প্রবাদ আছে। কিন্তু বাস্তবে মেয়েরা বউ হলে কখনোই হাতির মত খায় না। ধরলাম একটা মেয়ে বছরে ৬ টা ড্রেস বানায়। আপনি যদি সেই বছরে ৬ টা ড্রেস কিনে দিতে পারেন, তাহলে বিয়ে করতে আপনার এত ভয় কেন? কার বউকে দেখেছেন সব সময় নতুন নতুন শাড়ি পরে থাকতে?



